শিক্ষা সফরঃ ‘স্বপ্নপুরীর সময়’

 


০ আলমগীর জয় ০

২০০৫ সালের ১ মার্চ মঙ্গলবার দক্ষিন বঙ্গের ঐতিহ্যবাহী শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ শতবর্ষের দ্বার গোড়ায় উপনীত সরকারী রাজেন্দ্র কলেজের বায়তুল আমান শাখায় নব নির্মিত তিন তলা ভবনের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের পার্ট টু এর  ক্লাশে ভ্রমন বিষয়ক এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হিসেবে আলোচনা সভায় আমার উপস্থিতি থাকাটা একান্ত অপরিহার্য ছিল, কিন্তু ভ্রমনের ক্ষেত্রে উদ্ভূত ভ্রমনজনিত শারিরীক সমস্যার কারনে বরাবরই এসব আলোচনা ও আয়োজন ইচ্ছা করেই অনুপস্থিত থাকতে চেষ্টা করি। আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে পূর্বজ্ঞাত থাকায় এবারও অনুপস্থিতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখি। এবারে ভ্রমনে যাওয়া থেকে রেহাই পেলাম এই মনোতৃপ্তিতে  আত্নহারা হয়ে সেদিন আমার সখের পেশা মিডিয়া জগতে একট ুবেশি সময় ব্যায় করেই বাসায় ফিরলাম। কিন্তু ভাগ্য প্রতিকূল। বাসায় ফিরে খবর পেলাম আমাদের ডিপার্টমেন্টর মতিয়ার রহমান স্যার আমাকে তার সাথে দেখা করার জন্য জর্রুী তলব করেছেন। পরের দিন সকালে স্যারের বাসায় দেখা করলাম। স্যারের সাথে মিনিটি পাঁচেক কথা বলার পর মন থেকে ভ্রমনের অনিহা দূর হয়ে গেল। ভ্রমন অনিহা দুর হয়ে গেলেও চিন্তা করলাম আমার মত এক নগন্য ছাত্রর কথা স্যারকে কে স্মরন করে দিল। তখন জানতে না পারলেও পরে জানতে পেরেছিলাম প্রিয় দোস্ত ওবায়দুর রহমান, মুকসুদপুরের মাহফুজুর রহমান রিপন, আজিজুল হাকিম আমাকে শিক্ষা সফরে যাওয়ায় রাজি করাতে বিশেষ তৎপরতা চালিয়ে ছিল।

০৫ মার্চ ২০০৫ খ্রিঃ সন্ধ্যায় আমাদের সকল বন্ধু বর্গকে কলেজের শহর শাখার ভূগোল বিভাগে উপস্থিত থাকতে  বলা হল। যথারীতি সন্ধ্যা থেকে বিভাগে ভ্রমন আমেজ লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। রাত ৯.০০ টা নাগাদ সকলের আগমন সমাপ্ত হল। কলেজের শহীদ মিনার চত্ত্বর থেকে সকলে বাসে উঠতে যাব এমন সময় সেখানে হাস্যজ্জল মুখে উপস্থিত সকলের প্রিয়মুখ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, কবি সাহিত্যিক  শিক্ষক সংগঠক, কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ককামাল আতাউর রহমান (কনক রেজা)। সাথে সাথে আমাদের ডিপার্টমেন্টাল হেড মোঃ রমজান আলী স্যার। বাসে উঠার আগে তারা আমাদের ভ্রমণ নিরাপদ হওয়ার জন্য দোয়া করলেন। স্যার মহোদয়কে আমাদের সাথে যাওয়ার জন্য বিশেষ অনুরোধ করা হলেও পরের দিন কলেজ পরিচালনায় তাদের উপস্থিতি অপরিহার্য অযুহাতে আমাদের হাসিমুখে বিদায় দিলেন।

আমাদের গাড়ী ছুটে চলল দিনাজপুরের স্বপ্নপুরীর উদ্দেশ্যে। গাড়ি ছুটে চলার সাথে সাথে তারুন্যে উদ্বেলিত উচ্ছাসিত  আবেগে  গাড়ীর অডিও ক্যাসেটের  গানের তালে তালে শুরু হল বন্ধুদের ভ্রমন আনন্দের নৃত্য। গাড়ীর মধ্যে এ নৃত্যে অংশ গ্রহণ করল বিষ্ণু, আজিজ, রিপন, ওবায়েদুর, সাগর, বিপ্লব, রমজান। অবিরাম নাচ গানের সাথে সাথে গাড়ী স্বপ্নপুরীর দিকে ধাবিত হচ্ছে। সাথে সাথে রাতও  মধ্যাহ্ণ পার করে  শেষের দিকে অগ্রসরমান। গাড়ীর চলমান সময়ের মধ্যে বন্ধুদের অনেকেই বমি করার কাজটাও সেরে নিল। ভোর ৫.০০ টার সময় আমাদের গাড়ী গোবিন্দগঞ্জ থানার সামনে থামলো। আমরা জানতে পারলাম সকাল ৭.০০ টার আগে স্বপ্নপুরীর গেট খোলা হয় না। তাই সিদ্ধান্ত মোতাবেক  এখান থেকে প্রয়োজনীয় জরুরত সারার আয়োজন করা হল। জরুরতের এক ফাঁকে আমি ও আজিজ গোবিন্দগঞ্জ থানা দেখতে গেলাম। তখন সূর্য একটু একটু করে উকি দিচ্ছে। পরিস্কার আকাশ থাকায় ভালভাবেই থানা চত্তর ঘুরে দেখলাম।

থানা চত্ত্বর বেশ প্রসারিত। থানার প্রবেশ পথ হয়ে ভবন পর্যন্ত পীচ ঢালা রাস্তা।  রাস্তার দু পাশে অপরূপ সৌন্দর্যের নানা রকম ফুল গাছের ফুলের সৌরভ নিস্তব্ধ নিশি থেকেই নির্মল বায়ুতে বিলীন হচ্ছিল। থানা ভবনের ভেতরে ও খালি জায়গা, আগুন্তুকদের বসার স্থানে পাতা বাহার ও ফুল গাছের টব শোভা পাচ্ছিল। ভবনের উত্তর পাশের খালি জায়গায় গাড়ি রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন ফলজ , বনজ ও ঔষুধি গাছ তাদের সবুজের সমারোহ ঘটাচ্ছিল। একজন নতুন আগুন্তক থানা সম্পর্কে পূর্বজ্ঞাত না থাকলে এটাকে সুশোভিত বাগান  হিসেবে মনে করাটা বোধহয় তার ভুল হবে না।

রাতে বিশেষ কারন ব্যাতিরেকে থানার ভেতরে প্রবেশ নিষেধ থাকায় আগুন্তকদের  বসার নির্ধারিত স্থানে আমাদের বসতে বলা হল। বসার স্থানের সামনে গ্রীলের গেট, তার পাশে ডিউটিরত অফিসারের কামরা। এ রাতে ডিউটিতে ছিলেন পুলিশ অফিসার সামসুল। তিনি গ্রীলের ভেতর আমাদের সামনা সামনি বসলেন। বিভিন্ন বিষয়ে তার সাথে আমাদের কথা হল। কথা বলার এক ফাকে তিনি গেট না খোলার আইনগত বাধার কারনে সৌজন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। থানা থেকে বেড়িয়ে পার্শ্ববর্তী পান্তা পাড়া বস্তি  ও ডিগ্রী কলেজ বস্তি সম্পর্কে রিপোর্ট করার উদ্দেশ্যে তথ্য সংগ্রহ করলাম। (এ রিপোর্ট ০৮ মার্চ, ২০০৫ খ্রিস্টাব্দ  স্বনামে দৈনিক ভোরের রানার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।)

গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ থানায় ঘন্টা খানেক বিরতী শেষে আবার আমাদের গাড়ী ছুটে চলল দিনাজপুরের স্বপ্নপুরীর উদ্দেশ্যে। এ সময় দোস্ত এজিএস ওবায়দুর বেশ কিছু কাওয়ালী গান পরিবেশন করল। সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ আমাদের গাড়ী দিনাজপুর পৌছাল।

 


স্বপ্নপুরীঃ

দুই সহোদর সাবেক সংসদ সদস্য ও উপদেষ্টা মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান ফিজু  এবং প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ দেলোয়ার হোসেনের যৌথ পরিকল্পনায় ১৯৮৯ খ্রিঃ স্বপ্নপুরীর প্রারম্ভিক পরিকল্পনা শুরু হয়।  ১৯৯০ খ্রিঃ  দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আফতাবগঞ্জের এক মৃত জলাশয়কে পিকনিক স্পটে রূপান্তরের বাস্তবায়ন শুরু হয়। স্বপ্নপুরীর মোট জমির পরিমান ৪০০ বিঘা , মৌজাঃ খলিলপুর, পোষ্টঃ আফতাবগঞ্জ, থানাঃ নবাবগঞ্জ, জেলাঃ দিনাজপুর।  দিনাজপুর জেলা শহর  হতে এর দুরত্ব ৫২ কিলোমিটার।

প্রবেশ পথেই দেখতে পেলাম পর্যটকদের স্বাগত জানাতে সদা প্রস্তুত দন্ডায়মান বিশাল আকৃতির দুইটি পরীর প্রতিকৃতি। সহপাঠীদের তুমুল আনন্দ উল্লাসের মধ্যে দিয়ে স্বপ্নপুরীর ভেতরে আমরা পৌছে গেলাম। যথাস্থানের আমাদের গাড়ীটিকে পার্ক করানো হল। একে একে সবাই নেমে পড়লাম। ভ্রমনের ক্লান্তি দূর করতে আমরা সবাই উঠলাম স্বপ্নপুরীর সৌন্দর্যস্ফিত পরিবেশের রজনী গন্ধা বাংলোতে। গোসল করলাম স্বপ্নপুরীর মনোরম পুকুরের স্বচ্ছ জলকনায়। অতঃপর আমরা সকলে দলবদ্ধ হয়ে পুরো স্বপ্নপুরী স্বপ্নের মত ঘুরে দেখলাম।

স্বপ্নপুরীর ভেতরে রয়েছে দ্বীপ প্রতিকৃতির ২০০০ মিলেনিয়ামের প্রতীক। এর বায়ে ঝাউবিথি ও ডানে রয়েছে পামবৃক্ষ।  রয়েছে জাতীয় ফুল শাপলার পানির ফোয়ারা। স্বাপ্নিক ও সাংস্কৃতিক আবহ সৃষ্টিকারী নৃত্যরত তরুন তরুনীর ভাষ্কর্য অস্পরা। এছাড়া রয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে অবস্থিত বিশ্বকবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের ভাস্কর্য। অপরূপ সৌন্দর্য মন্ডিত স্বপ্নপুরীর বাগানের দৃশ্য মনকে মাতোয়ারা করে তুলে।  ঘন লতাপাতা গুলোর উত্থিত ঢেউ বেষ্টনীর মাঝে বাগান বিলাস আরো মনমুগ্ধকর। মন-মননকে আকাশচারী ও স্বপ্নময় করে তুলতে  রয়েছে নিপুন হাতের পরশের বাগ-বাগিচার সৌন্দর্য। স্বল্পিক বিস্ময়তা ও অনন্তের মুগ্ধতায় হৃদয়কে উদ্ভাষিত করতে স্বপ্নপুরির দৃষ্টিনন্দিত লেকে রয়েছে জলবিহারে মেতে উঠার দৃশ্য।  রয়েছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির  অন্যতম উপকরন এক তারার একটি দৃষ্টিনন্দন ভাষ্কর্য। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অপূর্ব পরিস্ফুটন ঘটানো  মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত  একটি ভাস্কর্য রয়েছে।  বিশাল স্বপ্নপুরীর স্থানে স্থানে রয়েছে বিশ্রাম ছাউনী। শিশুদের মনকে আনন্দময় করে তুলতে এখানে একটি সুন্দর শিশুপার্কও রয়েছে।  পর্যটকদের আনন্দ ভ্রমনের জন্য রয়েছে লেদা পোকা আকৃতির ট্রেন। স্বপ্নপুরীর লেকের উপরে  পর্যটকদের আনন্দ দেয়ার জন্য কেবল কার  রয়েছে। দৃষ্টি নন্দিত পুকুরে পর্যটকদের গোসল করার জন্য  রয়েছে শাপলা ঘাট।  এক নজরে পুরো  স্বপ্নপুরী দেখার জন্য ওয়ন্ডার হুইল।



স্বপ্নপুরীতে রয়েছে একটি কৃত্রিম চিড়িয়াখানা। চিড়িয়াখানায় প্রবেশের দ্বারটি দুটি বিশালাকৃতির ড্রাগনের সমন্বয়ে তৈরী। কৃত্রিম চিড়িয়াখানায় প্রাগৈতিহাসিক জগতের মডেলে প্রতিস্থাপিত ডাইনোসর গ্রুপের প্রাণী কেরাটোসরাসের ভাষ্কর্য। ডাইনোসর গ্রুপের স্টেগোরাসরাস নামক আরো একটি প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী রয়েছে। এছাড়া ফ্লামিংগো পাখির প্রতিচ্ছবি, কৃত্রিম বানরের রাজ্য, জেবড়ার প্রতিকৃতি,  বাংলাদেশের মানচিত্রের প্রতিচ্ছবি,  পেঙ্গুইনের প্রতিচ্ছবি,  জিরাফের প্রতিকৃতি, বিচ্ছুর প্রতিকৃতি, প্লাটিপাস প্রাণীর প্রতিচ্ছবি, মাইক ফুলের ভাস্কর্য,  কৃত্রিম মৎস্য কুমারীর নাচের দৃশ্যসহ মেনালোভা কৃত্রিম উপাদান।

স্বপ্নপুরীতে রয়েছে একটি জীবন্ত চিড়িয়াখানা। জীবন্ত চিড়িয়াখানার  প্রধান ফটকে রয়েছে বাংলার ঐতিহ্য বিশ্ববিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মুখাকৃতি যা পর্যটকদের শিহরিত ও রোমাঞ্চিত করে। চিড়িয়াখানায় ভল্লুক, হরিন, তিনপা বিশিষ্ট গরু, পাঁচ পা বিশিষ্ট গরু, বাংলাদেশের কলা গাছের অনুরূপ পান্থপদক, হনুমান, বিরল প্রজাতির অজগর সাপ, কুমির বিভিন্ন প্রজাতির হাঁসসহ অসংখ্য প্রাণী।

স্বপ্নপুরীর ম্বপ্নিল জগতে ঘুরতে ঘুরতে সকাল গড়িয়ে কখন দুপুর হয়েছে আমরা কেউই টের পাইনি। অবশেষে দুপুরে সবাই মিলে একসঙ্গে খেতে বসলাম। খাওয়ার পর সকলে ডাক বাংলোতে ফিরে এলাম। এখানে ছোট্ট একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করল দোস্ত মাহফুজুর রহমান রিপন। অনুষ্ঠানে যাত্রাভিনয় করল সাগর বিশ্বাস।  বাঁশি বাজালো উত্তম কুমার বিশ্বাস।  কবিতা গল্পসহ বিভিন্ন বিষয়ে অংশগ্রহণ করল  আজিজ, বিষ্ণু, রমজান, ওবায়েদুর, মৌসুমী, লোনা, আইভি প্রমুখ। এরপর যারযার মত  স্বপ্নপুরীর  স্বপ্নের মার্কেটে কেনাকাটা করতে গেলাম। আমি দুটি কাঠের কলম, দুটি বাঁশের তৈরী হাতপাখা কিনলাম। অতঃপর গাড়ীতে উঠে বসলাম। আমাদের গাড়ী ছুটে চলল বগুড়া জেলার ঐতিহাসিক মহাস্থান গড়ের দিকে।

 


মহাস্থানগড়ঃ

বগুড়া জেলার মহাস্থানগড় বাংলাদেশের সর্ব প্রাচীন ও  সর্ববৃহৎনগর পুন্ডনগরের ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান। এটি বর্তমানে মূল শহর থেকে  ১৩ কিলোমিটার উত্তরে ঢাকা দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে অবস্থিত। আমাদের গাড়ি মূল সড়ক ছেড়ে মহাস্থানগড় ঘেষে পূর্ব পাশের রাস্তা দিয়ে মহাস্থান গড়ের উত্তর দিকের সিড়ির সামনে থামলো। সবাই গাড়ি থেকে নামলাম।  সিড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। অনেক ছবি তুললাম। এরপর গোধূলী  লগ্নের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে পুরো এলাকা ঘুরে দেখলম।  এখানেই প্রফেসর মতিউর রহমান, কলেজ স্টাফ মিলন শিকদার ও আমি মাগরিবের নামাজ পড়লাম।

 

মহাস্থান গড়ের ইতিহাসঃ

আয়তাকার ধ্বংস স্তুপটি উত্তর দক্ষিনে ১৫০০ মিটার এবং পূর্ব পশ্চিমে ১৪০০ মিটার বিস্তৃত ও এর চারিদিকে নদী সমতল থেকে গড়ে ৬ মিটার উচু প্রতিরক্ষা প্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত।  প্রাচীরটির অভ্যন্তরে দক্ষিন পূর্ব কোনের সর্বোচ্চ স্থানটি জুড়ে রয়েছে শাহ সুলতান  মহী সওয়ারের মাজার ও মুঘল সম্রাট ফররুখ সিয়ার এর একটি মসজিদ। এই মসজিদকে ঘিরে একটি আধুনিক মসজিদ নির্মিত হয়েছে এবং সম্প্রতি এটি সম্প্রসারিত হয়েছে।

সুরক্ষিত এই নগরটির উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিন দিকের একটি গভীর পরীখা দ্বারা বেষ্টিত ছিল। উত্তর ও পশ্চিম দিকে এই পরীখা  পুরোপুরি এবং  দক্ষিন দিকে আহ্ণিক চিহ্ণ পরিদৃষ্ট হয়। তৎসময়ে পূর্ব দিকে করোতোয়া নদী প্রবাহিত ছিল। উত্তর দক্ষিন ও পশ্চিম দিকে ৮ (আট) কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে নগরের বাইরে বিভিন্ন  স্থানে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত বহু ঢিবি দেখা যায়। এগুলি প্রাচীন প্রাদেশিক রাজধানীর শহরতলীর সাক্ষ্য বহন করে। অনেক পর্যটক ও পন্ডিত ব্যক্তি বিশেষত বুকানন হ্যামিলটন, ওডোনেল, ওয়েস্টম্যাকট, বেভারীজ ও স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম এই শহরতলির এলাকা পরিদর্শন করেন এবং তাদের প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করেন। কিন্তু ১৮৯৭ খ্রিঃ সালে এ ধ্বংসাবশেষকে প্রাচীন পুন্ড্র নগরের ধ্বংসাবশেষ রূপে শনাক্ত করার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব স্যার আলেকজান্ডার কানিং হামের।  এখানে প্রাপ্ত ব্রাক্ষী লিপিতে উৎকীর্ণ একটি শিলালিপিতে পুন্ডনগল (পুন্ডনগর) উল্লেখ থেকে প্রমানিত হয় যে, নগরটি সাধারনত মোর্যদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এখানে দীর্ঘকাল ধরে অব্যাহত জনবসতি ছিল।

জানা যায়, ১৯২৮-২৯ খ্রিঃ সালে কে.এন. দীক্ষিতের তত্ত্বাবধানে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ কর্তৃক এ স্থানে প্রথম নিয়মানুগ উৎখনন পরিচালিত হয় এবং তিনটি ঢিবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এই ঢিবিগুলো স্থানীয় ভাষায় বৈরাগীর ভিটা, গোবিন্দ ভিটা ও মুনির ঘুন নামে পরিচিত একটি বুরুজসহ পূর্ব প্রাচীরের  কিছু অংশ। অতঃপর খনন কার্য তিন দশকের জন্য বন্ধ থাকে। ষাটের দশকের প্রথম দিকে খনন কার্য শুরু হয় এবং তা উত্তর দিকে প্রতিরক্ষা প্রাচীর এলাকা পশু রামের প্রসাদ, মাজার এলাকা, খোদা পাথর ভিটা, মানকালীর কুন্ড ধাপ এবং অন্যান্য স্থানে পরিচালিত হয়। এসব উৎখননের প্রাথমিক প্রতিবেদন ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত হয়।  প্রায় দু দশক পর ১৯৮৮ সালে খনন কাজ পুনরায় শুরু হয় এবং ১৯৯১ সাল থেকে প্রতিবছরই চলতে থাকে। এ সময় খনন কাজ মাজারে নিকটবর্তী এলাকা এবং উত্তর পূর্ব দিকের রক্ষা প্রাচীর সংলগ্ন অংশে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এ পর্যায়ে সম্পন্ন কাজের পরিমান এলাকাটির বিশালত্বের তুলনায় খুবই নগন্য ছিল। এ স্থানটির ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অনুক্রম এখনও অজ্ঞাত।

 


প্রত্নস্থল ও অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস পূর্নগঠন এবং প্রাচীন নগরটির সংগঠন সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্য একটা ব্যাপক অনুসন্ধান কাজ পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘকাল ধরে অনুভূত হচ্ছিল। ফলে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে  সম্পাদিত ১৯৯২ সালের চুক্তির অধীনে  ১৯৯৩ সালের  প্রথম দিকে  বাংলাদেশী ও ফরাসী প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তখন থেকে পূর্ব দিকের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের মধ্যভাগ সন্নিহিত স্থানে প্রতিবছর প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন কাজ পরিচালিত হতে থাকে। ইতঃপূর্বে সুরক্ষিত নগরের বাইরে ভাসুবিহার, বিহার ধাপ, মঙ্গল কোট ও গোদাই বাড়ির ন্যায় কয়েকটি স্থানেও বাংলাদেশের  প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ কর্তৃক খনন কার্য পরিচালিত হয়েছে।

দৈনিক ইনকিলাব ২৭ মার্চ ২০০৬ খ্রিঃ তারিখে শেষ পাতায় ডাবল কলামে ‘সুনিপুন গাঁথুনি আর শৈল্পিক কারুকার্য প্রমান করেছে তাদের দক্ষতা-শোল্ডারে ‘‘মহাস্থান গড়ে সপ্তম শতাব্দীর বৌদ্ধ সভ্যতার বহু নিদর্শনের সন্ধান লাভ’ শিরোনামে মাহফুজ মন্ডল, বগুড়া অফিস- বাইনেমে মহাস্থান গড়ের উৎখননের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়,

জানুয়ারি’২০০৬ খ্রিঃ থেকে মার্চ ২০০৬ খ্রিঃ পর্যন্ত খনন কাজের জন্য বেছে নেয়া হয় হযরত শাহ সুলতান মাহী সওয়ার বলখীর (রঃ) এর মাজারের দক্ষিন পশ্চিম কর্নারের সুউচ্চ একটি টিলা। এই টিলা খনন করে আবিস্কার করা হয় সপ্তম শতাব্দীর বৌদ্ধ সভ্যতার কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। সুনিপন গাথুনী আর ইমারতের শৈল্পিক কারুকার্যই প্রমান করেছে সপ্তম শতাব্দীর বৌদ্ধ সভ্যতার মানুষ কতটা দক্ষ ছিল। কাজের শরুতে সুউচ্চ টিলার দক্ষিন পশ্চিম কর্নারে পাওয়া যায় প্রাচীন বাংলার রাজধানী মহাস্থান গড়ের (পুন্ডনগর) প্রাচীন রাজপথ। অত্যান্ত সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো পোড়া মাটির বড় বড় ইট দ্বারা নির্মিত এই রাস্তাটি বৌদ্ধদের মন্দির থেকে বের হয়ে পশ্চিম প্রান্তে বানারশি সরোবরের দিকে চলে গেছে।  খুব সম্ভবত এই ঘাটেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা স্নান করতো। দেড় হাজার বছর আগের তৈরী রাস্তা দেখে মনেই হবে না এই রাস্তার এত বয়স। মনে হয় এই মাত্র এক শৈল্পিক কারিগর রাস্তাটি তৈরী করে রেখে গেল। এখনো কালের সাক্ষী হয়ে অক্ষত হয়ে আছে প্রাচীন কালের এই রাস্তাটি। এই রাস্তার কোল ঘেষে সন্ধান পাওয়া যায় বৌদ্ধদের সমাধি ও স্মৃতিশৌধ এবং বৌদ্ধদের ধর্মীয় প্রার্থনালয়। এই প্রার্থনালয় থেকে উদ্ধার করা হয়েছে কয়েকটি বৌদ্ধ মূর্তি। যা প্রমান করে এটিই বৌদ্ধদের প্রার্থনা কক্ষ।  এছাড়া বৌদ্ধ সভ্যতার পোড়া মাটির বুটিক, বল, শিল, নেড়া ও ভিন্ন ধরনের মাটির তৈরী তৈজসপত্র।

ফ্রান্স থেকে আগত অভিজ্ঞ প্রত্নতাত্ত্বিকদের  ধারনা সপ্তম অথবা অষ্টম  শতাব্দীতে এখানে বৌদ্ধ সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। বৌদ্ধদের মৃতদেহ সৎকারের জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল বৌদ্ধ সমাধি বা স্মৃতিশোধ বা সুউচ্চ স্তুপ। এছাড়াও পাওয়া যায় বৌদ্ধ সমাধি, সমাধি সৌধের প্রবেশ পথ, সুউচ্চ সিড়ি। এই সিড়ি গুলো কোথাও কোথাও পাথর দ্বারা নির্মিত। সিড়ির অপর প্রান্তে স্তম্ভসহ নির্মিত  কক্ষ গুলোর মধ্যে থেকে পাওয়া যায় বৌদ্ধ মূর্তি। যেখানে বৌদ্ধরা প্রার্থনায় মশগুল থাকতো। প্রাচীর ঘেরা এই বৌদ্ধ সমাধিটি ছিল অত্যান্ত সুরক্ষিত। (অসমাপ্ত- ২৮ মার্চ, ২০০৬ খ্রিস্টাব্দ)

 (লেখকঃ আলমগীর জয়, শিক্ষার্থী (২০০২-২০০৩ সেশন)

ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর, মোবাইলঃ 01912144849)

Comments

Popular posts from this blog

মহিন উদ্দিনঃ নিভৃতচারী বন্ধুর বিদায়

নিজস্ব প্যাচাল ১২ : ‘ঈদানন্দ ও বেদনাবোধ’