মহিন উদ্দিনঃ নিভৃতচারী বন্ধুর বিদায়

 

মহিন উদ্দিনঃ নিভৃতচারী বন্ধুর বিদায় 

০ আলমগীর জয় ০

কে প্রিয় আর প্রিয় নয়; এটা নির্ণয় করা যতটা কষ্টসাধ্য, ঠিক ততটা কষ্টসাধ্য নয়, কে অপ্রিয় এটা নির্ণয় করতে। অপ্রিয়টা সহজেই নির্নয়যোগ্য।

নামের বিকৃতি করাটা আমাদের মজ্জাগত। ফটিককে ফইটক্যা, হাসেমকে হাসু, আজিজকে আইজ্যা, মজিদকে মইজ্যা বলতে অভ্যস্ত। মহিন উদ্দিন; যাকে প্রথম প্রথম মঈন উদ্দিন নামেই জানতাম এবং সেভাবেই তাকে সম্বোধন করতাম শেষে ভাই যোগ করে। অনেক দিন পরে ফরিদপুর ‘হাজার পঞ্চান্ন’ নির্বাচনে কাজ করার সময় প্রিন্টেড কাগজে দেখলাম মহিন উদ্দিন। মইন ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম, মঈন ভাই আপনার নামের বানান ভুল হইছে, তাও আবার আপনিই টাইপ করেছেন। মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, আমার নাম সঠিকই আছে। মানে কি? বলতেই বললেন, আমার নাম মহিন উদ্দিন; কিন্তু সবাই মঈন উদ্দিন বলে ডাকে। আমি চেষ্টা করলাম এবং বারবার চেষ্টা করলাম মঈন নামে ডাকলে তিনি রেগে যান কিনা। এই বিকৃত নামে ডাকলে বা সম্বোধন করলে তার মুখ-অবয়বের কোন পরিবর্তন হয় কিনা তাও নির্নয়ের চেষ্টা করেছি বহুবার।

একবার একটি বাইনেমের নিউজে আমার নাম ভুল ছাপা হয়েছিল, খুব খারাপ লেগেছিল। ব্যক্তিগতভাবে অভিজ্ঞতার্জনের মাধ্যমে দেখেছি দুটি কাজে মানুষ তাৎক্ষনিক ক্ষেপে উঠে। একটি হচ্ছে রাতের বেলায় পথ চলার সময় কারো মুখে বা চোখের দিকে টর্চ লাইট মারলে [আলো ফেললে]। আর একটি ভুল নামে কাউকে ডাকলে। লাইটের আলো ফেললে সরাসরি ক্ষিপ্ততা প্রকাশ করলেও ভুল নামে ডাকলে সরাসরি ক্ষিপ্ততা প্রকাশ না করলেও মনে মনে বেজায় ক্ষেপে থাকে বিকৃত নামে যিনি অপরকে সম্বোধন করেন। যথাসম্ভব তাকে এড়িয়ে চলারও চেস্টা করা হয়।

কিন্তু মহিন ভাইয়ের ক্ষেত্রে আমি এই প্রকাশ্য ক্ষিপ্ততা কখনোই দেখিনি, আর অপ্রকাশিত ক্ষিপ্ততা কখনো অনুভব করিনি। এই বিষয়টি আমাকে দারুন ভাল লাগিয়েছে, অপরের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখায় তিনি কতটা আন্তরিক।

২০০৪ সাল নাকি তারও পরে ঠিক মনে নেই; কবে থেকে মহিন ভাইর সাথে পরিচয় বা সম্পর্কের সূত্রপাত। যতদূর মনে পড়ে ২০০৪ সালের দিকে দৈনিক ভোরের রানারের কম্পিউটারে কাজ করতো আজিজুল নামের আমাদের সম-বয়সী একজন। প্রথম দিকে মহিন ভাই’র সাথে একটা ইতস্ততঃ বোধ সম্পর্ক ছিল আমার। না সে এগুতো, না আমি এগুতাম। দুজনেরই মুখ ভর্তি চাপ দাড়ি ছিল। প্রথম দিকে আমি ভেবেছিলাম সে হয়তো কট্টর হুজুর টাইপের আবার সেও  হয়তোবা এমনই ভেবে ছিলো। তবে শার্ট-প্যান্ট-গেঞ্জি-টি শার্ট পড়ায় আমরা অভ্যস্ত ছিলাম। এদিক দিয়ে মিল ছিল। শেখ মনির হোসেন তুষার বেশ আগে থেকেই ভোরের রানারের স্টাফ রিপোর্টার ছিল। মনির, আমি আর মহিন ভাই মিলে একটা সময় খুব ভাল সম্পর্কে উন্নীত হই আমরা। প্রায়ই রাতেই খন্দকার হোটেল বা অন্যকোন খাবারের হোটেলে নান রুটি আর খাশির পায়ার হালিম খাওয়ার অভ্যাস ছিল আমাদের। একদিন মনির একদিন মহিন আবার একদিন আমার বিল নির্ধারণ করে নিতাম। একবার হলো কি, হালিম খেতে গিয়ে আমার দাত নড়বড়ে হয়ে গেল। আমার কি যে বিব্রত অবস্থা! তখন অবশ্য দাতগুলোর অপারেশন পরবর্তী সময় ছিল। কোন একরাতে হালিম খাওয়ার সময় মোবাইলের সিম নিয়ে কথা হচ্ছিল। তখন মোবাইলের সীমের খুব কম দাম। মাত্র ৭৫ টাকা পারপিচ। কি মনে করে মহিন ভাইকে একটি সীম দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অনেক দিন পার হলেও তা আর দেয়া হয়নি। ততদিনে অবশ্য দামটাও বেড়ে গিয়েছিল। আমি অনেক দায়ী মনে করতাম নিজেকে; কথা দিয়ে রাখলাম না; পরে অবশ্য কোনরকমে কথা রাখতে পেরেছিলাম।

লেখার সাথে যে ছবিটি দেয়া হয়েছে, সম্ভবত ২০০৫ বা ২০০৬ সালের দিকে দৈনিক ভোরের রানারের কার্যালয় থেকে ছবিটি তুলে দিয়েছিলেন স্পোর্টস রিপের্টার মানিক দাস। এখানে আরো একজনের ছবি ছিল, তার অনুমতি নেই তাই সে অংশটা কেটে দেয়া হয়েছে।

যতদূর মনে পড়ে আমাদের এই নানরুটি আর পায়ার হালিম খাওয়া সমাপনি হয়েছিল যেদিন ফরিদপুর ডিসি অফিসে অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। হঠাৎ করেই চাকুরিতে যোগ দেয়াটা আমাদের তিনজনের নিয়মিত বা অনিয়মিত খাওয়া পর্বটা ওখান থেকেই সমাপ্তি হয়েছিল। পেশাগত পরিবর্তন সম্পর্কের পরিবর্তনকে বাধ্য করে। ২০১০ সালের পর থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মহিন ভাইর সাথে প্রথম দিকে বহুবার কথা হয়েছে, যোগযোগ হয়েছে। একসাথে বসেছি। পরে আস্তে আস্তে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সরাসরি সাক্ষাৎটা অনেকাংশে কমে যায়। একদিন পত্রিকা পড়ে জানতে পারি তিনি এ জগতে নাই। ততক্ষনে তার দাফনও সম্পন্ন হয়ে গেছে।

নফসের ভুল-ক্রুটি মার্জনা করে মহান স্রষ্টা তাকে শান্তিতে রাখুন;- এই কামনা করি।

-০-

লেখকঃ আলমগীর জয়
সাবেক স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক ভোরের রানার, ফরিদপুর
মোবাইলঃ ০১৯১২১৪৪৮৪৯
তারিখঃ ১২ জানুযারি ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
alamgirfpur@gmail.com

Comments

Popular posts from this blog

শিক্ষা সফরঃ ‘স্বপ্নপুরীর সময়’

নিজস্ব প্যাচাল ১২ : ‘ঈদানন্দ ও বেদনাবোধ’