নিজস্ব প্যাচাল ১২ : ‘ঈদানন্দ ও বেদনাবোধ’
০
আলমগীর জয় ০
স্পষ্টই মনে আছে। বাড়ির পাশে সোনা মিয়া টুকটাক মুদি মালামাল বিক্রি করতেন। তার
দোকান থেকে ১ টাকায় ৮ টি চকলেট কিনতাম। গ্রাম থেকে একটু দূরে খলিল মন্ডল হাট; মোহাম্মাদের
দোকান বা ছাত্তার মন্ডলের দোকান থেকে ১ টাকায় প্রথম দিকে ১২ টি; পরবর্তীতে ১০ টি চকলেট
কিনতাম। তখন স্কুলে একা যাওয়ার মত বয়স হয়েছে।
স্কুলে গেলে মা প্রতিদিন নগদ ১ টাকা দিতেন আর মোহাম্মাদের দোকানে বাকি খাওয়ার
অনুমোদন ছিল ১ টাকা। নগদ বাকি মিলে আমার দৈনন্দিন স্কুলে গমনাগমনের টিফিন খরচ এই ২
টাকাই বরাদ্দ ছিল। কাউকে ছোট বা বড় করছি না, সমবয়সীদের তখনো কারো ১০ পয়সা, কারওবা ২৫
পয়সা বরাদ্দ পেতে দেখেছি।
বলে রাখি বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে (শহরাঞ্চলে তো বহু আগে থেকেই বিরাজিত) ঈদের নামাজ
শেষে যে সালামীর প্রচলন আছে, ঐ সময়ে এর কিছুই ছিল না। নামাজে যাওয়ার আগে আমাদের সর্বসাকুল্যে
বরাদ্দ থাকতো ১০ টাকা। এটা নিয়েই খুশি। আমাদের ঈদের দিনে নামাজ শেষে কেনাকাটার পরিধিও
খুব সংকীর্ণ ছিল। ২৫ পয়সায় অর্ধেক নীল-অর্ধেক লাল কালারের ১টা মালাই, ২/৩ টাকার মধ্যে
মাটির তৈরী ব্যাংক, ১/২ টাকার মধ্যে ঢাউস সাইজের বেলুন, ৫০ পয়সায় বাশের বাশি, ১ টাকায়
বেলুন লাগানো বাশের বাশি, এই যা!
ঘটনাটি ঐ সময়ের এক ঈদের দিনের। তখন জেলা সদরের চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের জমাদ্দার
ডাংগী গ্রামের বাড়িতে থাকি।
আজাদ বিশ্বাস আমার মামা। আমাকে ভালবাসায় তার কখনো কমতি ছিল না। তিনি চাকুরি
করতেন সেটেলমেন্টে; দূর-দুরান্তে, ষান্মাষিক চুক্তিতে। ছুটিতে বাড়িতে আসলেই চলে আসতেন
আমাদের বাড়ি। সেবারও ঈদের আগের রাতে আসলেন। ঈদের খরচের জন্য আমাকে টাকা দিলেন। দু-চার,
পাঁচ-দশ টাকা নয়; ৫০ টাকার একটি নতুন নোট। মাত্র ১০ পয়সায় যখন একটি চকলেট পাওয়া যায়,
তখন 5,000 পয়সা বা ৫০ টাকা আমার জন্য অত্যাধিক বেশি। তদুপরি ঈদের দিনের নামাজ শেষে
আমার কেনাকাটার পরিধিও যৎসামান্য, সবোর্চ্চ ৬ টাকা খরচ হয়।
পরের দিন অর্থাৎ ঈদের দিনে সকালে গোসল শেষে জামা গায়ে দিলাম। জামাটা ছিল বেশ
চমৎকার। পিছনের অংশ এক কালার, সামনের অংশ অন্য কালার, পকেটটা আবার ভিন্ন কালার। পকেটের
নিচে ডাবল কাপড় ছিল। আগেই আমি বুদ্ধি করে জামার নিচের অংশের ডাবল কাপড়ের একটা পার্ট
ব্লেড দিয়ে কেটে গোপন পকেট করে রেখেছিলাম। জামাটা গায়ে দিলে বোঝা যেত না ভেতরে পকেট
আছে। এই গোপন পকেটে মামার দেয়া ৫০ টাকা রাখলাম। আব্বা ১০ টাকা দিলেন, সেটা ওপরের পকেটে
রাখলাম। অতঃপর নামাজে গেলাম পার্শ্বস্থ চরমাধব দিয়া ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে।
ঈদ ও কোরবানীর নামাজটা অত্রাঞ্চলে ওখানেই হয়ে থাকে। নামাজ শেষে খলিল মন্ডলের হাটে আসলাম।
ঈদের মেলাটা ওখানেই বসে। ১ টা মাটির ব্যাংক কিনলাম। আর কিছু কেনার ইচ্ছা না থাকায় বাড়ি
চলে আসবো। এসময় কি মনে করে জামার গোপন পকেটে হাত দিলাম। হাত দিয়েই ভীত বিহবল হয়ে উঠলাম।
ওখানে কোন টাকা পেলাম না। আবারো পকেটে হাত দিলাম; কিন্তু পকেটে টাকাটা নেই। ওই পকেট
থেকে কেউ নিয়েও যায়নি টাকাটা। গোপন পকেটে টাকাটা আছে মনে করে বারংবার হাত ঢুকাচ্ছিলাম;
কিন্তু বরংবারই হাতটা শূন্য। যদিও টাকাটা আমার তেমন কোন প্রয়োজনই ছিল না, তথাপি মনটা
ভীষন রকমের খারাপ হয়ে গেল।
ঘটনাটি ঐ সময় বা পরেও কাউকে বলি নাই। ২/৪ বছর
আগে দু’চারজনের নিকট কখনো গল্প করে থাকতে পারি!
মানুষের নানা ধরনের দুঃখবোধ থাকেই। কিন্তু আমার সমস্ত দুঃখবোধ ঐ ঈদের দিনে ৫০ টাকা
হারানোর কাছে ম্রিয়মান।
-০-
গুহলক্ষীপুর, ফরিদপুর

Comments
Post a Comment