ফরিদপুর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শিল-পাটা খোঁটানো মিস্ত্রি


ফরিদপুর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শিল-পাটা খোঁটানো মিস্ত্রি          

০০০ আলমগীর জয় ০০০

এক সময় গ্রামাঞ্চলের পথে প্রায় দিনই ঝোলা কাধে নানা আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি নিয়ে যাদের দেখা যেত তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল শিল-পাটা খোটানো মিস্ত্রি। কালের বিবর্তনে- আধুনিকতার ছোয়ায়, চাহিদার ভিন্ন মাত্রায় এখন আর তাদের সচরাচর দেখা যায় না। এই পেশাটা এখন প্রায় লুপ্ত। কদাচিৎ দেখা মিললেও তাদের সংখ্য নিতান্তই নগন্য। যদিওবা কখনো দেখা যায়, তথাপি তাদের আগের মত ঐতিহ্যবাহী সিস্টেম আর নাই। 

আগেরকার দিনে সকাল হলেই শিল-পাটা খোটানো মিস্ত্রিরা কাধে একটি ঝোলা নিয়ে বেড়িয়ে পড়তেন। তাদের ঘাড়ে থাকতো দা ধার দেয়ার জন্য পাথর বসানো প্যাডেল আর হাতে থাকতো একটি ছোট ঝোলা বা ব্যাগ। ব্যাগের মধ্যে  রাখতেন যন্ত্রপাতি। যন্ত্রপাতি যে খুব বেশি থাকতো তা নয়; ৩/৪ টি হাতুড়ি, ৩/৪ টি ছেনি। হাতুড়ি গুলো বসে কাজ করা যায় এমনভাবে হাতের মাপে তৈরী থাকতো। ছেনি গুলো বেশির ভাগই থাকতো পুরনো। দু একটি ছেনি দেখতে বড়ো আকৃতির পেরেকের মতো । মূলত: ছেনির পেছন দিকে হাতুড়ির আঘাত পড়তে পড়তে থেঁতলে গেছে; তাই পেরেকের মতো লাগতো। কারো কারো ঝোলার মধ্যে ছোট সাইজের পাটের বস্তা থাকতো; যার উপর বসে কাজ করতে সহজ হতো। এছাড়া অধিকাংশের পকেটে থাকতো মোটা ফ্রেমের চশমা। খোটানোর সময় যেন চোখে পাথরকুড়ি প্রবেশ না করতে পারে সেজন্য এই ব্যবস্থা।

শিল-পাটা খোঁটানো মিস্ত্রিরা সাধারনত গ্রামের একদিক থেকে শুরু করতেন হাটা। প্রতিটি বাড়ি গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেন, শিল- পাটা ধারবেন? কখনো কখনো কয়েকটি বাড়ির শিল-পাটা খোটানোর জন্য একটি বাড়ির নির্দিষ্ট জায়গায় বসতো। কয়েক বাড়ির শিল পাটা একটি স্থানে রাখা হতো। তার চোখে চশমা পড়ে একটির পর একটি তিনি খোটাতেন। কারো কারো একটু তাগিদ থাকতো আগে দেয়ার জন্য। মিস্ত্রি একের পর এক কাজ করতেন।

আধুনিক সময়ে সব কিছুর ই মূল্য যেমন টাকা দিয়ে পরিমাপ করা হয়; তখন সে রকম ছিল না। শিল পাটা খেটানো মিস্ত্রিরা সব সময় টাকা নিয়ে কাজ করতেন না। কখনো কখনো গ্রামের নানা রকম ফসলের মাধ্যমেও দরদাম মেটানো হতো। তবে সাধারনত খাদ্য দ্রব্যই দাম পরিশোধের জন্য বেশি ব্যবহৃত হত। যেমন ধান কাটার মৌসুমে ধান বা চাল নিতেন, গমের সময় গম বা আটা নিতেন। এছাড়া মশুরী, কালাই, খেসারী, ভূট্টা, কাউন, পেয়াজ, রসুন, শুকনা মরিচও নিতেন।

শিল-পাটা খোঁটানো মিস্ত্রিরা সকালে বেড়িয়ে রাতে বাড়ি ফিরতেন এমন নয়। অধিকাংশ মিস্ত্রি দু চার ছয় মাসে বাড়ি ফিরতেন। তবে রাত্রি যাপন করতেন কখনো কখনো স্থানীয় রেল স্টেশনে, কখনো বা কোন গ্রামের মাতব্বরের বাড়ির কাচারী ঘরে।

তারা নিজেরা রান্না করে খেতেন। গৃহস্তের বাড়ি থেকে কাজের বিনিময়ে আনা চাল ডাল দিয়ে রান্না করতেন। ক্ষেত্র বিশেষে রান্না করার জন্য পাট কাঠি বা বাশের শুকনো কঞ্চি, বা গোবরের বুইন্দা, বা গোবরের মুঠিও কাজের বিনিময়ে নিতেন।

বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ফরিদপুরে এ পেশায় প্রায় হাজার খানেক লোক যুক্ত ছিল। এদের বেশির ভাগের বসতই জেলার ভাঙ্গা উপজেলায়। তবে আশপাশের উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের লোকেরা এ পেশায় আসতেন। অন্যান্য উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের লোকজনও কমবেশি জড়িত থাকতেন। এছাড়া জেলার বাইরে থেকে এ জেলায় এসে কাজ করতেন অনেকে।


সময় পরিবর্তনশীল। সময়ের পরিবর্তনতার সাথে সাথে শিল-পাটা খোটানো মিস্ত্রিদেরদেরও পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিকতার ছোয়ায় কালের বিবর্তনে এখন অনেকটাই ম্রিয়মান এ পেশা। অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।


এখন আর গৃহিনীদের হলুদ বাটতে হয় না, শুকনো মরিচ, ধনিয়া, আদা রসুন, পেয়াজ বাটতে হয় না। ধনিয়া, জিরা, হলুদ, আধুনিক মেশিনের সাহায্যে ভাঙ্গানো যায়, ভাঙ্গানো যায় শুকনো মরিচ। ফলে গৃহিনীদের কষ্টও কমেছে, কমেছে শিল-পাটার উপর নির্ভররতা। আদা পেয়াজ রসুন ব্লেন্ডার মেশিনে বেল্ড করা হয়। বাটনা বাটার ঝামেলা সেখানে নেই। এছাড়া এখন বাজারে প্রায় সব প্রকার গুঁড়ো মশলা পাওয়া যায়।

গৃহস্তের বাড়ি দা, কোদাল, শাবল, বটি, কাচি, নিড়ানী নিত্য পন্য। কমবেশি সব গৃহস্থ পরিবারে এসব থাকতো। কিন্তু ক্রমেই নগরায়নের প্রভাবে গৃহস্থালি ব্যবস্থা বিলিনের সাথে সাথে দা কোদাল, শাবল, বটি, কাচি, নিড়ানীর বিলুপ্তির শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রান্না ঘরে দা এর গুরুত্ব কমে গেছে। বাজার থেকে বড় মাছ আর মুরগি কেটে আনার প্রবনতা দা কে অনেকটাই অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছে রান্না ঘরের কর্তী। বটি এখনো কিছুটা প্রচলন থাকলেও মাঝারী মানের চাকুর ব্যবহার তাকে মধ্যবৃত্তের আধুনিক রান্না ঘর গুরুত্বহীনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শিল-পাটা খোটানো মিস্ত্রিরা পাটা খোটানোর সাথে সাথে দা-বটি ধারানোর কর্মটিও অনেকাংশে কমে এসেছে।

 এসব বিভিন্ন কারনে ক্রমেই বিলুপ্তির তালিকায় চলে গেছে শিল-পাটা খোটানোর মিস্ত্রি। আধুনিকতা গৃহিনীদের কর্মকে সহজ করে দিলেও হারিয়ে যাচ্ছে ফরিদপুর জনপদের ঐতিহ্যবাহী শিল-পাটা খোটানো মিস্ত্রি।
(লেখক: সাবেক সংবাদকর্মী, বর্তমানে সার্কিট হাউস নাজির, ফরিদপুর)












Comments

Popular posts from this blog

মহিন উদ্দিনঃ নিভৃতচারী বন্ধুর বিদায়

সাদিয়ার গল্প

নিজস্ব প্যাচাল ১২ : ‘ঈদানন্দ ও বেদনাবোধ’