স্নিগ্ধ, প্রশান্ত ও কোমল তারা‘র খোঁজে অতুল
০ আলমগীর জয় ০
দুপুর আর বিকেলের মাঝে ক্ষনিক সময়ের জন্য সেদিন শহরের
উপর দিয়ে এক পশলা বৃষ্ঠি হয়েছিল। গাছের পাতাগুলো একটু ছোয়া পেয়েছিল, পথ ঘাটের উপরে
ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধুলাবালি মাটিতে লেপ্টে গিয়েছিল। প্রকৃতির খেয়াল বোঝা মুশকিল। বিকেল
তখন যৌবনে, কালো মেঘ কেটে গিয়ে আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে পুঞ্জ পুঞ্জ সাদা মেঘ। বাতাশে
হেলে দুলে একের গায়ের বৃষ্টির পানি অপরকে ছিটিয়ে দিচ্ছিল আর হেসে যেন কুটিকুটি
খাচ্ছিল পদ্মা পাড়ের কাশ ফুল গুলো।
কাশফুলের শুভ্রতা আর দিগন্ত জোড়া সবুজ আমন, নাবি আমন ধানের ক্ষেত চোখ জুড়িয়ে দেয়।
দৃষ্টির সীমানায় দু চারটা প্লটে খড়ের আস্তরণ ভেদ করে আখের চারা গুলো এদিক সেদিক
তাকাতাকিতে ব্যস্ত। ভেজা এবং স্যাঁতসেঁতে মাটিতে
আগাম শীতের মুলা, লালশাক, পালংশাক, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুনের বীজ তলা
করে ধামা কাখে কৃষানীকে তখন ফিরতে শুরু করেছে আঙ্গিনার দিকে। সৌন্দর্য পিয়াসীরা তখনো গোধূলি-আকাশে মগ্ন। পাখিরা দল বেধে গাছের
ডালে বসে দিনের সর্বশেষ আলাপ আলোচনা সেরে নিচ্ছিল।
শহরের কোলাহলে এ সৌন্দর্য প্রায়
অনুপস্থিত। তথাপি হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের ফাঁকে চোখ গলিয়ে নীল আকাশের তুলার মতো সাদা
মেঘ কজনেরই বা দেখার সৌভাগ্য হয়! কিছু কিছু সৌন্দর্য শহরেও পাওয়া যায়।
বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা নামার
অপেক্ষায়। গোধূলী লগ্ন যায় যায়। মুজিব সড়কের বাতি গুলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে।
সড়কের দু পাশে কামলারা মানুষ বিক্রির হাট থেকে নিজেকে বিক্রি শেষে বাড়ি ফিরতে শুরু
করেছে। উচু ভবনের ছাদে পাখিদের সর্বশেষ আলাপ চারিতা সম্পন্ন। গ্রাম থেকে শহরের
বিকিকিনির গ্রাম্য বৃদ্ধও গায়ের পথ ধরেছে।
০৪ অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ; রোজ রবিবার। শহরের আদিকেন্দ্র ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জেলা প্রশাসনের গাড়িটি ধীরে ধীরে ছুটে চলেছে। গন্তব্য শ্রদ্ধাভাজন বর্ষীয়ান শিক্ষাবিদ-সাংবাদিক জগদীশ চন্দ্র ঘোষের ঝিলটুলীর বাসা। শুভ্রতার প্রতীক জগদীশ চন্দ্র ঘোষ ফরিদপুরে সর্বজন মহলে তারাপদ স্যার নামেই খ্যাত।
ধীরে ধীরে
জেলা প্রশাসনের গাড়ি পৌছল ঝিলটুলী। অল্প সময়েই সৃজনশীল কর্মগুনে জেলাবাসীর হৃদয়ে প্রসারিত
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী
অধ্যাপক চির সবুজ শিক্ষক-সাহিত্যিক রেজভী জামান গাড়ি থেকে নামলেন। আগে থেকেই সেখানে আপেক্ষমান ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ,
সাংবাদিক, সুলেখক, অনলবর্ষী সুবক্তা প্রফেসর মোঃ শাহজাহান, তারাপদ স্যারের ছোট ভাই
চিত্ত রঞ্জন ঘোষ। একে একে সবাই তারাপদ স্যারের বাড়িতে প্রবেশ করলেন। সেখানে
উপস্থিত ছিলেন তার পরিবারের সদস্য প্রফেসর শিপ্রা রায়।
প্রবীণ সাংবাদিক এবং শিক্ষাবিদ শুভ্রতার প্রতীক
তারাপদ স্যার এখন বার্ধক্যপীড়িত। সব কথা মনে করতে পারেন না। কাউকে কাউকে চেনেন,
আবার কাউকে ভুলে যান।
জেলা প্রশাসক অতুল সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতা এবং
সংবেদনশীলতার সাথে তাঁর সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলেন। কর্মময় জীবনের উপর আলোকপাত করে
জগদীশ স্যার এ সময় অনেক স্মৃতিচারণ করেন। জেলা প্রশাসক মহোদয় তাঁর পাশে বসে তাঁর
কথা মনোযোগ দিয়ে শ্রবন করেন।
শুভ্রতার প্রতীক তারাপদ কখনো চিন্তা করেননি শিক্ষক হবেন। তবে তারুণ্যের শুরুতে পেশা হিসেবে শিক্ষকতাই বেছে নিতে হয়েছিল। শুরু থেকে শিক্ষার্থীদের কাছে পরম প্রিয় তারাপদ স্যার। কেবল শিক্ষাবিস্তারে নয়, সমাজের যেকোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সব সময় এগিয়ে এসেছেন এই শিক্ষাগুরু। ফরিদপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েছেন ১৯৯৫ সালে। অবসরজীবনে শুভ্রতার প্রতীক হয়ে আছেন শিক্ষার্থীদের কাছে।
লম্বা একহারা গড়ন। বয়স ৯2,
চামড়া কুঁচকে গেছে। তাঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই, কৈশোর আর তারুণ্যের দিনগুলোতে তিনিই
ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে সাঁতার কাটতেন, কুস্তি লড়তেন দাপটের সঙ্গে। আরও পরে নানা সামাজিক
আর সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জড়িয়ে পড়েন আন্দোলন–সংগ্রামে। শিক্ষকতার জন্য
হয়ে ওঠেন সবার শ্রদ্ধার পাত্র।
আড্ডাপ্রিয় তারাপদ স্যার
প্রিয় কাউকে পেলে আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠেন। জেলা প্রশাসক অতুল সরকার, প্রফেসর মোঃ শাহজাহান,
রেজভী জামান কে পেয়ে অনেক স্মৃতিই তার মনে পড়তে থাকে। গল্পে ডুবে যান।
মা–বাবার দ্বিতীয় সন্তান
জগদীশ চন্দ্র ঘোষ। জন্ম মানিকগঞ্জের কাঞ্চনপুর গ্রামে, ১৯২৯ সালের ৬ আগস্ট। শিক্ষাজীবন
শুরু ফরিদপুরের ঈশান গোপালপুর গ্রামের এক টোলে। সেখানে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে
ভর্তি হন একই গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
গ্রামে পড়াশোনা শেষ হলে জগদীশকে
তাঁর বাবা নিয়ে যান ফরিদপুর শহরে। ভর্তি করিয়ে দেন হিতৈষী স্কুলে। স্কুলের পড়াশোনার
চেয়ে অবশ্য কুমার নদের পাড়ে ঘুড়ি ওড়াতেই ভালো লাগত তাঁর। ভালোবাসতেন সাঁতার কাটতে।
সারা দিন ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কেটে যায় দুটি বছর।
ষষ্ঠ শ্রেণির চৌকাঠ পেরোতেই
জগদীশকে আবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। ভর্তি হন শিবরামপুরের আর ডি একাডেমিতে। ১৯৪৮ সালে
সেখান থেকেই ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশ নেন। এরপর ভর্তি হন কলকাতায়, আশুতোষ কলেজে। কিছুদিন
যেতেই কলকাতাজুড়ে শুরু হয় দাঙ্গা। প্রতিদিন খুন–হামলা। সেখান থেকে তাঁর এক আত্মীয়ের
সঙ্গে বহরমপুর চলে যান। ভর্তি হন স্থানীয় একটি কলেজে। সেই প্রতিষ্ঠানেই ইংরেজি ও গণিত
বিষয়ে বিশেষ দক্ষ হয়ে ওঠেন তারাপদ। তবে ওই কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার আগেই
তাঁকে ফিরে আসতে হয় বাড়িতে, ঈশান গোপালপুরে।
বাড়ি ফিরে চাকরি নেন পোস্টমাস্টারের।
পোস্ট অফিসে চাকরি করতে গিয়েই খেয়াল করলেন, তাঁর বয়সী অনেকেই পড়ার জন্য প্রতিদিন আট
মাইল দূরের ফরিদপুর শহরে যান। জগদীশ চন্দ্র তাঁদের ডেকে বলেন, ‘তোরা আমার কাছে পড়তে
পারিস, আমি অঙ্ক ও ইংরেজি পড়াতে পারি।’
ম্যাট্রিক উত্তীর্ণ এক তরুণ
উচ্চমাধ্যমিকের গণিত-ইংরেজি পড়াবে, এ কথা ভেবে কারও কারও চোখেমুখে ফুটে ওঠে অবিশ্বাসের
ছাপ। অভয় দিয়ে তখন জগদীশ চন্দ্র বলেন, ‘একবার পড়েই দেখ, যদি পারি তবে পড়বি, না হলে
পড়বি না।’
কয়েকজন তরুণ অবশ্য তারাপদ
স্যারের ওপর আস্থা রাখেন। পড়া শুরু করার কয়েক দিনের মধ্যেই তরুণদের কাছে তারাপদ স্যার
হয়ে ওঠেন নির্ভরতার প্রতীক। আর এভাবেই শিক্ষকতায় হাতেখড়ি জগদীশ চন্দ্র ঘোষের। ছাত্র
পড়ানোর শুরুর কয়েক মাস পরেই পাশের গ্রামের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন প্রধান শিক্ষক
হিসেবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পোস্ট অফিসে পোস্টমাস্টারের চাকরিটিও চালিয়ে যান। সব মিলিয়ে
মাস শেষে পান ২৬ টাকা।
কিন্তু ফরিদপুরের জন্য ভীষণ
মন টানত জগদীশের। তাই ১৯৫৩ সালের দিকে ফিরে যান ফরিদপুরে। চাকরি পেয়ে যান শৈশবের সেই
হিতৈষী স্কুলে। মাসে বেতন ৫০ টাকা। ফরিদপুরে তখন ভালো গণিত শিক্ষকের অভাব। তাই এক বছর
যেতে না–যেতেই ময়েজউদ্দিন স্কুলে ডেকে নেওয়া হয় তাঁকে। ১৯৫৩ সালের শেষ দিকের কথা সেটি।
জগদীশ তখনো ম্যাট্রিক পাস।
তাই তাঁর মনে হলো, অন্তত ডিগ্রি পাস করা উচিত। ১৯৫৪ সালে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন রাজেন্দ্র
কলেজে। তত দিনে পারিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়েছে। সব দায়িত্ব ওঠে তাঁর কাঁধে।
দিনরাত টিউশনি করে কলেজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে কলেজে যাওয়া বন্ধ,
পড়াশোনায় বিরতি। চলতে থাকে শিক্ষকতা আর টিউশনি। ১৯৫৯ সালে যোগ দেন ফরিদপুর উচ্চবিদ্যালয়ে।
পরের বছর প্রাইভেট ছাত্র হিসেবে উত্তীর্ণ হন উচ্চমাধ্যমিকে। এরপর বিএ পাসও করেন প্রাইভেট
ছাত্র হিসেবে।
জগদীশ চন্দ্র ঘোষ ১৯৬৮ সালে
যোগ দেন পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায়। শিক্ষকতার শুরু থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন
পরোক্ষভাবে। সমাজের নানা উন্নয়নকাজেও তাঁর অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। ফরিদপুরের জনপ্রিয়
এই শিক্ষক সব সময় সাদা রঙের পোশাক পরেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমি চাই, আমার সামনে যে ছাত্রটি
বসে আছে, সে যেন আমার এই শুভ্রতা ধারণ করে। সে যেন এই স্নিগ্ধ রংকে তার মনন গঠনের রং
হিসেবে বেছে নেয়। তার রুচি যেন হয় মানবতার রুচি।’
ছোটবেলা থেকেই রাজনীতি–সচেতন
ছিলেন। কাছ থেকে দেখেছেন তাঁর চাচার স্বদেশি আন্দোলনে যুক্ততা। কিন্তু কখনো কোনো রাজনৈতিক
দলের সঙ্গে যুক্ত হননি। ১৯৭১ সালের ২ মে পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের শিকার হয় তাঁর
পরিবার। ফরিদপুর সদরের ঈশান গোপালপুরে জমিদারবাড়ির হত্যাযঞ্জে ২৮ জন শহীদ হন। তাঁদের
মধ্যে ছিলেন জগদীশের বাবা যোগেশ চন্দ্র ঘোষ, ভাই গৌর গোপাল ঘোষ ও চাচাতো ভাই বাবলু
ঘোষ।
যেকোনো শুভ কাজে তিনিই এগিয়ে
আসতেন সবার আগে। ফরিদপুর শহরে নারীশিক্ষার জন্য প্রথমে সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজ এবং
সারদা সুন্দরী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা অগ্রগণ্য। ফরিদপুর টাউন
থিয়েটার, ফরিদপুর প্রেসক্লাবসহ শহরের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ততা
তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কখনো নেতা হননি। গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে যাননি। তবে নেতা
নির্বাচনের কারিগর ছিলেন তিনি।
তাই তো শিক্ষকতা পেশার অনন্য
উদাহরণ হয়ে উঠেছেন জগদীশ চন্দ্র ঘোষ। মানুষ তাঁকে দেখে গুরুভক্তি করে তাঁর কর্মের জন্যই।
এমন একজন ক্ষণজন্মা গুরুর
সান্নিধ্য প্রাপ্তির আশায়, একজন গুরুর প্রতি অপরিসীম ভালোবাসার টানে ফরিদপুরের সুযোগ্য, সুদক্ষ,
জনবান্ধব জেলা প্রশাসক অতুল সরকার ছুটে গেলেন তার গৃহে। নিলেন তার সার্বিক
খোঁজখবর।
-০-
আলমগীর জয়
ফরিদপুর
তারিখঃ ২১ অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
মোবাইলঃ ০১৯১২১৪৪৮৪৯
-০-
বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতাঃ পান্না বালা, ফরিদপুর অফিস প্রধান,
দৈনিক প্রথম আলো।
তথ্যসূত্রঃ ০১। জনাব রেজভী
জামানের ফেসবুকের স্মৃতিচারণ।
০২। দৈনিক প্রথম আলো, ১২ অক্টোবর, ২০১৯।
-সমাপ্ত-


Comments
Post a Comment